Posts Tagged ‘ইয়োগা’

[Yoga] আপনি কেন ইয়োগা চর্চা করবেন…

————————–
[Yoga] আপনি কেন ইয়োগা চর্চা করবেন… (হাইপার-লিঙ্কড ইয়োগা-সমগ্র)
————————–
রণদীপম বসু
———–

জীবনের বহু বহু ব্যস্ততার মধ্যে আমাদের সময়ই হয় না নিজেকে একটু একান্ত করে দেখার। আমি কে, কী, কেন, কোথায়, কিভাবে, এ প্রশ্নগুলো করার। অথচ সামান্য এ ক’টা প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের সবটুকু রহস্য, ঠিকানা, পরিচয় এবং অস্তিত্বের অনিবার্য শর্তগুলোও। প্রশ্নের এই স্বচ্ছ আয়নায় নিয়ত বদলে যাওয়া জীবনের জলছবিগুলোই আমাদের প্রতিটা যাপন-মুহূর্ত, চলমান জীবন। অসংখ্য সমস্যার গেরোয় জট পাকিয়ে যাওয়া আমাদের জটিল জীবনযাত্রার জট খোলার চাবিটাও যে রয়ে গেছে সেখানেই, কেউ কেউ ঠিকই জানেন, আর অনেকেই তার খোঁজ রাখি না আমরা। এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই এগুতে এগুতে অন্তর্ভেদী দার্শনিক ব্যক্তি যাঁরা, একসময় পৌঁছে যান ঠিকই জীবন ছাড়িয়ে মহাজীবনের বিপুল রহস্যের উজ্জ্বলতম দোরগোড়ায় এক অভূতপূর্ব বিস্ময় নিয়ে ! কিন্তু আমরা যারা অতি সাধারণ জন, খুব সাধারণ দেখার চোখ নিয়েও তারা কি পারি না এই অগুনতি যাপনের ভিড়ে শুধু একটিবার নিজের দিকে ফিরে তাকাতে ? যে আমাকে নিয়ে আমি নিত্যদিনের কর্মশালায় খাচ্ছি-দাচ্ছি-হাসছি-খেলছি-ঘুরছি আর মগ্ন হচ্ছি চিন্তায় বা দুঃশ্চিন্তায়, আমাদের সে ‘আমি’টা দেখতে কেমন, তা কি জানি আমরা ?

আপনি কি জানেন, ঠিক এ মুহূর্তে আপনি কেমন আছেন ? কিংবা কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে ? আসুন না, নিজস্ব আয়নাটার সামনে খুব একান্তে দাঁড়াই একটু ! এবার নিজেকে উন্মোচিত করুন। কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে ? ওই আয়নায় যেটা দেখছেন, সেটা আপনার দৈহিক অবয়ব। এই দেহই আমাদের ধারক, বাহক, এবং চালক। এই দেহকে ঘিরে, দেহের মাধ্যমে, এবং দেহের জন্যই আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড। মন বলে যে বিমূর্ত ধারণাপিণ্ড কল্পনা করি আমরা, তাও এই দেহনির্ভর। দেহ ছাড়া মন বিকৃত, অসম্পূর্ণ, অচল। দেহের বিনাশ ঘটলে মনের আর কোন অস্তিত্ব নেই, থাকে না। এ জন্যেই প্রাচীন যোগশাস্ত্রেও উক্ত হয়- ‘শরীরমাদ্যং খলু ধর্ম সাধনম’। আপনি যা কিছুই সাধন করতে চান না কেন, এই দেহ ছাড়া গতি নেই, উপায়ও নেই। দৃশ্যমান এই দেহের অস্তিত্ব মানেই বাস্তবে আপনার অস্তিত্ব। দেহ নেই, আপনি নেই। দেহ ছাড়া কেউ থাকে না। দেহত্যাগের পরেও আপনার যে নামটা থেকে যাবে কিছুকাল আপেক্ষিক সময় জুড়ে, তাও এই দেহেরই অবদান। এই দেহ ধারণ করে দেহের মাধ্যমে করে যাওয়া কৃতকর্মই তার আপেক্ষিক স্থায়িত্বের মাধ্যমে আপনার অবর্তমানে আপনার নামটাকে বাঁচিয়ে সম্ভাব্য আপেক্ষিক স্থায়িত্ব দিতে পারে। অতএব, ভালো করে দেখুন- যে দেহটা এ মুহূর্তে ধারণ করে আছেন আপনি।

হতে পারেন আপনি নারী বা পুরুষ, এবার বলুন তো, আয়নায় আপনার যে মানবদেহের অবয়ব দেখছেন, তা কি যেমনটা হওয়ার বা থাকার কথা তেমনই আছে ? চোখ, মুখ, নাক, কান, মুখমণ্ডল, গলা, কাঁধ, বাহু, হাত, বুক, পেট, পিঠ, কোমর, উরু, পা, আঙুল, নিতম্ব, জঙ্ঘা, জননেন্দ্রিয় তথা গোটা দেহকাঠামো সম্পূর্ণ, সুঠাম, সুস্থ, সবল, নিরোগ, অবিকৃত, নিখুঁত, স্বাভাবিক সুন্দর, সক্রিয় ও সাবলীল ? এবার অন্তর্চক্ষু উন্মিলিত করুন। কল্পনা করুন আপনার দেহের ভেতরে অবস্থিত আভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-তন্ত্রিগুলোর কথা। মস্তিষ্ক, স্নায়ুরজ্জু, বিবিধ হরমোন গ্রন্থি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, ধমনী, শিরা-উপশিরা, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, মাংস-পেশী-অস্থি-মজ্জা-মেরুদণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, রক্তসংবহনতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র, বিপাকক্রিয়াদিসহ ইত্যাদি সমূহ সিস্টেম বা প্রক্রিয়া কি সুস্থ, স্বাভাবিক, সক্রিয় ও সাবলীল আছে ? আরো আছে আপনার স্বপ্ন-কল্পনা-ভাবনার বিস্ময়কর বিমূর্ত সেই জগত, যেখানে গ্রন্থিত হয় সৃজনের অবিরল স্রোত। সেও কি শারীরিক ও মানসিক বাধামুক্ত সতেজ উদ্যমে গতিমান ? এসবের উত্তর যদি ‘হাঁ’ হয়, শুধু আমি নই, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সবাই আপনাকে স্যলুট বা অভিবাদন জানাবে। উত্তর যদি হয় ‘না’, তাহলে দেরি নয়, এখনই ভাবুন, এক অসম্পূর্ণ অপভ্রংশ দৈহিক ও মানসিক অস্তিত্ব নিয়ে কতদূর যেতে পারেন আপনি ? আর আপনার এ চলার পথই বা কতোটা নিরাপদ, উদ্বেগহীন, ইচ্ছা-স্বাধীন ?

কথায় বলে- সুস্থ দেহ সুন্দর মন। কথাটা সর্বাংশেই সত্য। দৈহিক সুস্থতার কোন বিকল্প নেই। একটা নিরোগ সুস্থ-সুঠাম সতেজ কর্মঠ দেহের সাথে মানসিক ভ্রান্তিহীন চাপ নিরপেক্ষ সুডোল মনের রাখীবন্ধন ঘটলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবনের নিশ্চয়তা মেলে। কিন্তু আমাদের জীবন-বাস্তবতায় তা কতোটা অর্জন সম্ভব ?

দৈহিক সুস্থতার জন্যে প্রয়োজন সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম। কিন্তু পরিশ্রম পরিকল্পিত না হলে দৈহিক সৌন্দর্য ও সুস্থতা নিশ্চিত হয় না। দেহের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা না হলে দেহবিন্যাস সুষম ও সুগঠিত হতে পারে না। এজন্যেই দেহের জন্য দরকার হয়ে পড়ে পরিকল্পিত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের। আমাদের এ নাগরিক সভ্যতায় মাঠ-ঘাট-খোলা জায়গা এখন যেভাবে ধীরে ধীরে কল্পজগতের বস্তু হয়ে ওঠছে তাতে করে শরীরচর্চার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। কিন্তু দেহের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পেশী হাড় অস্থিসন্ধি ও রক্তসংবহনতন্ত্রের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা রক্ষার অনন্য মাধ্যম হিসেবে ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম এখানে তুলনাহীন। যোগ-ব্যায়ামের বিভিন্ন আসনগুলো চর্চার জন্য আপনার ঘরের স্বল্পপরিসর মেঝে বা আপনার বিছানাটাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।

দেহের জ্বালানী হলো খাদ্য। তা পেলেই দেহ তার অভ্যন্তরস্থ বিশেষ বিশেষ দেহযন্ত্রের মাধ্যমে পরিবহন পরিবর্তন রূপান্তর করে নিজেকে সচল ও সবুজ সতেজ বৃক্ষের মতো পল্লবিত করে তোলে। কিন্তু খাওয়ার নামে প্রতিনিয়ত যা গিলছি আমরা তা কি আদৌ খাদ্য ? বিষাক্ত ভেজালের যুগে এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না আর। অতএব আমাদের দেহযন্ত্রের কারখানায় বিষ থেকে অমৃত সৃজনের প্রযুক্তি যতকাল রপ্ত না হবে, ততকাল ক্রমে ক্রমে নিঃসার হয়ে আসা দেহগহ্বরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সচল ও সক্রিয় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা না নিয়ে কোন উপায় আছে কি ? তার শ্রেষ্ঠ উপায়ই হচ্ছে ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম। স্নায়ু গ্রন্থি রক্তনালী শিরা-উপশিরা ও দেহের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটা দেহযন্ত্রের যথাযথ ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে এগুলোকে পরিপূর্ণ সতেজ ও কার্যকর রাখতে ইয়োগাই অনন্য মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে যোগাসনগুলো ছাড়াও বিভিন্ন মুদ্রাগুলোর সমকক্ষ কোন পদ্ধতি একমাত্র ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম ছাড়া অন্য কোন ব্যায়ামে এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। যেভাবে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের সক্রিয় সুস্থতা রক্ষার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে ইয়োগার শ্বাস-ব্যায়াম প্রাণায়াম। এমনকি অত্যাবশ্যকীয় ইন্দ্রিয়গুলোর কার্য়কর সুরক্ষার জন্যেও ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

খাবার গ্রহণ করলেই দেহের কাজ শেষ হয়ে যায় না। এই খাদ্য থেকে বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খাদ্য-উপাদান ও খাদ্যরস সংগ্রহ শেষে পরিত্যক্ত খাদ্যবর্জ্যগুলো মল-মূত্র ঘাম বা কফ হিসেবে শরীর থেকে বের করে দিতে হয়। এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হলেও শরীর অসুস্থ হয়ে পড়তে বাধ্য। এই প্রক্রিয়াটাকে সুস্থ সচল রাখতে অন্য সাধারণ ব্যায়ামে কোন উপায় না থাকলেও ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়ামে প্রয়োজনীয় ধৌতিগুলো খুবই কার্যকর উপায়।

জীবন যাপনের চলমান বাস্তবতায় যে সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি রাষ্ট্র পরিবেশ ও পরিস্থিতি উদ্ভুত স্ট্রেস বা মনো-দৈহিক চাপের মধ্য দিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত পার করতে হয় আমাদের, তা থেকে পরিত্রাণের যে ছটফটানি, এটা আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রতিনিয়ত ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে যাচ্ছে। সেই দুঃসহ চাপের উৎস পরিবর্তনের সুযোগ বা সামর্থ হয়তো আমাদের নেই। কিন্তু সেই অসহনীয় চাপ সফলভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে স্নায়ুরোগসহ যে মনো-দৈহিক সমস্যা বা রোগের বিস্তার ঘটে, প্রয়োজনীয় শিথিলায়ন ও প্রয়োজনীয় নিরাময়ের ব্যবস্থা না নিলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। এই মনো-দৈহিক সমস্যা উত্তরণে অনন্যোপায় আমাদেরকে এ জন্যেও ইয়োগার আশ্রয়ই নিতে হবে।

প্রিয় পাঠক, চিন্তা বা ধারণা স্বচ্ছ না হলে আয়নায় নিজের অবয়ব দেখেও স্পষ্ট করে বুঝার উপায় নেই যে, বস্তুত যা হওয়ার কথা, নিজের সাথে তার কোথায় কেন কিভাবে কতটুকু তফাৎ বা পার্থক্য পরিদৃষ্ট হচ্ছে এবং কিভাবে তার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। সেজন্যই আমাদের জানার আগ্রহটাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। দেহ-মনের সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা করে সুস্থ-সুন্দর জীবন-যাপনের এ যাবৎ শ্রেষ্ঠ উপায় যেহেতু ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা, তাই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি জানার সাথে সাথে পরিপূর্ণভাবে অভ্যাসের সুবিধার্থে ইয়োগা দর্শনটাকেও জানা আবশ্যক বিবেচনা করি। আমি কেন ইয়োগা চর্চা করবো (Why do I practice Yoga) তা যেমন বুঝতে হবে, তেমনি জানতে হবে ইয়োগা কী বা এর ইতিহাস, আধুনিক ইয়োগার জনক হিসেবে চিহ্ণিত গুরু পতঞ্জলি কেন তাঁর অভ্রান্ত অষ্টাঙ্গযোগ মানব সভ্যতাকে উপহার দিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ প্রায়োগিক ও মনো-দৈহিক স্বাস্থ্য দর্শন হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই এটাকে ধর্মীয় আধ্যাত্মিক দর্শন ভেবে ভুল করে ফেলেন কেন ? কিসের ভিত্তিতে আমরা ইয়োগা অনুশীলন করবো এবং অন্য ব্যায়ামের সাথে এর মৌলিক ভিন্নতা কোথায় তা যেমন জানতে হবে, তেমনি এর জ্ঞাতব্য বিষয়গুলোও মনোযোগ সহকারে ধারণ করে নিতে হবে। এসব বিষয় আগ্রহে বিশ্বাসে অনুধাবন করে নিজের প্রতি আস্থা ফিরে পেলেই কেবল নিজেকে ইয়োগা চর্চায় প্রস্তুত বলে গণ্য করতে হবে। এবং এ জন্য আপনাকে প্রতিদিন কেবল নিজের জন্য তিরিশটি মিনিট ব্যয় করতে প্রতিজ্ঞ হতে হবে।

ইয়োগা একটি পরিপূর্ণ দর্শন। অমিত ধৈর্য্য, প্রয়োজনীয অনুশীলন ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মধ্য দিয়ে মনো-দৈহিক স্বাস্থ্য ও সামর্থ অর্জনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানবসত্তার চরম উৎকর্ষতা অর্জনের উপায়ই এই দর্শনের অভীষ্টতা। ব্যক্তি তার চেষ্টা ও সামর্থ্য অনুযায়ী ফললাভ করে থাকেন। সাধক যোগী পুরুষ যেমন প্রয়োজনীয় তপস্যার মাধ্যমে নিজেকে আধ্যাত্মিক শিখরে আরোহন করতে পারেন, তেমনি ব্যক্তি-সাধারণের দৈহিক সুস্থতা ও সামর্থ অর্জনের জন্য এখানে উল্লেখ রয়েছে প্রচুর আসন, মুদ্রা, প্রাণায়ামধৌতি অভ্যাসের। যোগশাস্ত্রিরা এগুলোর প্রতিটার কার্য-কারণ, সতর্কতা ও ফললাভের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সুন্দরভাবে। এমনকি প্রচলিত রোগ-বালাই নিরাময় কিংবা তা থেকে মুক্ত থাকার উপায়ও বাৎলে দিয়েছেন। দেহগঠন, বয়স কিংবা রোগ বিবেচনায় নিজ প্রয়োজনে ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যচর্চা নির্বাচনের কৌশলও বর্ণিত হয়েছে এতে। একমাত্র ইয়োগা ছাড়া মানবদেহ ও মনের এমন পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য দর্শন আদৌ আর আছে কিনা জানা নেই।

যদি আমরা আমাদের অবিকল্প এই দেহটিকে সকল কর্মকাণ্ডের কার্য ও কারণ বলে বিশ্বাস করতে সক্ষম হই, তাকে সুস্থ সবল সক্রিয় ও সুন্দর রাখতে উদ্ভুত প্রশ্নটি ‘আপনি কেন ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা করবেন’ এভাবে না হয়ে হওয়া উচিৎ- আপনি কেন ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা করবেন না !

(C) কপিরাইট:
। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত ও ব্যবহৃত যাবতীয় ছবির নিজ নিজ উৎসের স্বীকৃত স্বত্ব কৃতজ্ঞতার সাথে বহাল রেখে- এই হাইপার-লিঙ্কড পাণ্ডুলিপির সর্বস্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত ।
Advertisements

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |১০১| প্রয়োজন মতো ব্যায়াম নির্বাচন |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |১০১| প্রয়োজন মতো ব্যায়াম নির্বাচন |
– রণদীপম বসু

# নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন

কারো জন্যেই সবগুলো ব্যায়াম বা যোগ-ব্যায়াম একসাথে একদিনে করা সম্ভব নয় এবং তা উচিত বা প্রয়োজনও নেই। আবার বৈচিত্র্যহীন একই ব্যায়াম রোজ রোজ করলেও একঘেয়ে লাগার সম্ভাবনাই বেশি। এতে করে ব্যায়ামে মনঃসংযোগ ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে। আর মনঃসংযোগ না থাকলে ইয়োগা বা যৌগিক ব্যায়ামে তেমন সুফল পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও বয়স, সামর্থ্য ও শারীরিক জটিলতাজনিত কারণে প্রয়োজন বিবেচনায় সব আসন বা ব্যায়াম সবার জন্য প্রযোজ্যও হয় না। তাই নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এ জন্যে বয়স অনুযায়ী কোন্ কোন্ ব্যায়াম প্রযোজ্য হবে এই ধারণা যেমন থাকা জরুরি, তেমনি শরীরের কোন অঙ্গ বা গ্রন্থির জন্য কোন ব্যায়াম ফলপ্রসূ তাও জানতে হয়। পাশাপাশি কোন্ রোগে কোন্ ব্যায়াম ফলদায়ক তা জানার পাশাপাশি কোন্ রোগের জন্য কোন্ ব্যায়াম অভ্যাস করা নিষেধ বা অনিষ্টকর তাও জানতে হবে। নইলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাকে কোনভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

একজন সুস্থ ব্যায়াম অভ্যাসকারীকে রোজ গুটিকয় খালি হাতে ব্যায়াম অভ্যাসের পর ২/৩ মিনিট শবাসনে বিশ্রাম নিয়ে ৬ থেকে ৮টি যৌগিক ব্যায়াম যথানিয়মে অভ্যাস করার পর সবশেষে মিনিট পাঁচেক শবাসন করে দৈনন্দিন ব্যায়াম অভ্যাস শেষ করা উচিত। সর্বাঙ্গাসন, মৎস্যাসনশবাসন ছাড়া কোন আসনই এক-দু’মাসের বেশি একনাগাড়ে অভ্যাস করার প্রয়োজন নেই। প্রতি দু’মাস অন্তর ব্যায়াম তালিকায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দৈনন্দিন তালিকায় হাতের, বুকের, মেরুদণ্ডের ও পায়ের ব্যায়াম হয় মতো কিছু খালিহাতে ব্যায়াম কিংবা আসন এবং বিভিন্ন গ্রন্থি ও স্নায়ুর মধ্যে যাতে রক্ত চলাচল ভালোভাবে হয় সে জন্যে যৌগিক ব্যায়াম হতে নিজ প্রয়োজন মতো ৭/৮টি আসন ও মুদ্রা নির্বাচন করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে এক-দু’টা সহজ-প্রাণায়ামও দৈনন্দিন তালিকায় থাকতে পারে। এভাবে নির্বাচিত ব্যায়াম, আসন ও মুদ্রাগুলো দু’মাস অভ্যাসের পর একঘেয়েমি দূর করতে তালিকাটির আমূল বা আংশিক পরিবর্তন করে নেয়া উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন দেহের সব অংশে প্রচুর রক্ত চলাচল করে এবং সর্বাঙ্গাসন, মৎস্যাসনশবাসন প্রভৃতি অত্যাবশ্যকীয় আসনগুলো কোন তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।

অসুস্থ ব্যায়াম অভ্যাসকারীদের বেলায় রোগ নির্ণয়ের পর উপযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য ও প্রয়োজনমতো বিশ্রামের পাশাপাশি রোগ অনুযায়ী ৪/৫টি আসন নির্বাচন করে দিনে দু’বেলা সকাল সন্ধ্যায় চর্চা করার অভ্যাস করা যায়।

প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন ও দৈনন্দিন তালিকাভুক্তির সুবিধার্থে বয়স, দেহের বিভিন্ন অংশ ও রোগ-নিরাময় বিবেচনায় প্রয়োজনীয় যৌগিক ব্যায়ামের তালিকা জেনে রাখা সবার জন্যেই সুবিধাজনক।
———————————————————

(ক) বয়স ও সামর্থ্য উপযোগী যৌগিক ব্যায়ামের তালিকা:

(০১) ৬ থেকে ১২ বছর উপযোগী (ছেলে ও মেয়ে)-
পদ্মাসন, পদহস্তাসন, অর্ধ-চক্রাসন, অর্ধ-চন্দ্রাসন, চন্দ্রাসন, চক্রাসন, ভুজঙ্গাসন, পূর্ণ-ভুজঙ্গাসন, ধনুরাসন, পূর্ণ-ধনুরাসন, উষ্ট্রাসন, পূর্ণ-উষ্ট্রাসন, মৎস্যাসন, শশঙ্গাসন, অর্ধ-মৎস্যেন্দ্রাসন, অর্ধ-কুর্মাসন, পশ্চিমোত্থানাসন, ভদ্রাসন (বদ্ধ-কোণাসন), ব্যাঘ্রাসন, গড়ুরাসন, বৃক্ষাসন, বকাসন, ত্রিকোণাসনশবাসন। (আসনগুলো এক-দু’বারের বেশি অভ্যাস করা ঠিক হবে না।)

(০২) ১৩ থেকে ১৬ বছর উপযোগী (ছেলে ও মেয়ে)-
০১ নং তালিকায় উল্লিখিত ব্যায়াম ও তার সঙ্গে পবন-মুক্তাসন, উত্থিত-পদাসন, শলভাসন, গোমুখাসন, হলাসন, জানুশিরাসন, বিভক্ত-জানুশিরাসন, বজ্রাসন, সুপ্ত-বজ্রাসন, আকর্ণ-ধনুরাসন, সর্বাঙ্গাসন, বদ্ধ-সর্বাঙ্গাসন, পূর্ণ-বদ্ধসর্বাঙ্গাসন, মকরাসন, পূর্ণ-মকরাসন, দণ্ডায়মান একপদ-শিরাসন, সিদ্ধাসন, কুক্কুটাসন, বিপরীতকরণী মুদ্রা যোগমুদ্রা

(০৩) ১৭ থেকে ২০ বছর উপযোগী (ছেলে ও মেয়ে)-
০১ ও ০২ নং তালিকায় উল্লিখিত ব্যায়াম ও মুদ্রা এবং তার সঙ্গে গর্ভাসন, কর্ণ-পিঠাসন, উড্ডীয়াননৌলী মুদ্রা (মেয়েদের ঋতু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে উড্ডীয়ান ও নৌলী মুদ্রা অভ্যাস করা উচিত নয়)।

(০৪) ২১ থেকে ৩০ বছর উপযোগী (নারী ও পুরুষ)-
০১, ০২ ও ০৩ নং তালিকায় উল্লিখিত ব্যায়াম ও মুদ্রা এবং তার সঙ্গে শীর্ষাসন, শক্তিচালনী মুদ্রাসহ কয়েকটি সহজ মুদ্রা, বস্তিক্রিয়াসহজ-প্রাণায়াম

(০৫) ৩১ থেকে ৪০ বছর উপযোগী (নারী ও পুরুষ)-
০১, ০২, ০৩ ও ০৪ নং তালিকায় উল্লিখিত ব্যায়াম, মুদ্রা ও প্রাণায়াম-এর অনুরূপ। তবে এমন কোন আসন অভ্যাস করা উচিত হবে না যাতে মেরুদণ্ডের বা দেহের কোন সংযোগস্থলে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। যেমন- চক্রাসন, চন্দ্রাসন, পূর্ণ-উষ্ট্রাসন, পূর্ণ-ধনুরাসন, বিভক্ত-জানুশিরাসন, দণ্ডায়মান একপদ শিরাসন ইত্যাদি অভ্যাস না করাই বাঞ্ছনীয়।

(০৬) ৪১ বছর এবং তদুর্ধ্ব বয়সোপযোগী (নারী ও পুরুষ)
৬ থেকে ৮টি সহজ স্বাস্থ্যাসন যেমন- পবনমুক্তাসন, ভূজঙ্গাসন, মৎস্যাসন, সর্বাঙ্গাসন, ধনুরাসন (সহজে যতটুকু সম্ভব), উষ্ট্রাসন (সহজে যতটুকু সম্ভব), হলাসন, জানুশিরাসন ইত্যাদি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুয়েকটি মুদ্রাপ্রাণায়াম

৫০ বছরের পর থেকে ভ্রমণ-প্রাণায়াম বিশেষ উপকারী।

———————————————————

(খ) দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শিরা-উপশিরা, স্নায়ু, গ্রন্থি সুস্থ ও সক্রিয় রাখার উপযোগী য়ৌগিক ব্যায়ামের তালিকা:












(১২) হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস-
প্রাণায়াম


(১৪) চোখ-
ত্রাটক

(১৫) কণ্ঠ-
সিংহাসন
———————————————————

(গ) রোগ নিরাময়ে উপযোগী আসন ও মুদ্রা:






(০৬) স্থূলতা-
খালিহাতে ব্যায়াম ও সূর্য-নমস্কার, পবনমুক্তাসন, পদহস্তাসন, অর্ধ-চন্দ্রাসন, ত্রিকোণাসন, উত্থিত-পদাসন, মৎস্যাসন, সর্বাঙ্গাসন এবং উষ্ট্রাসন, ধনুরাসনহলাসন। রাতে ঘুমানোর পূর্বে দশ-পনেরো মিনিট বজ্রাসনদিবানিদ্রা নিষিদ্ধ।












(১৮) পক্ষাঘাত-
সকালে বিকেলে ভ্রমণ-প্রাণায়াম। সামর্থ বৃদ্ধির সাথে সাথে খালিহাতে সহজ ব্যায়াম ও বিভিন্ন যৌগিক ব্যায়াম।

(১৯) স্নায়বিক দুর্বলতা-
রোগের উৎস-কারণ হিসেবে চিহ্ণিত রোগ বা জটিলতা দূরীকরণার্থে প্রয়োজন-সংশ্লিষ্ট আসন ও মুদ্রা অভ্যাস।

(২০) যৌনসমস্যা-
প্রাতে সহজ বস্তিক্রিয়া, ভদ্রাসন (বদ্ধ-কোণাসন), উষ্ট্রাসন, শশঙ্গাসন, বিভক্ত-জানুশিরাসন, উড্ডীয়ান, মূলবন্ধ মুদ্রা, মহামুদ্রা, মহাবন্ধমূদ্রা, অগ্নিসার এবং প্রয়োজনে স্নায়বিক দুর্বলতা নিরসন সংশ্লিষ্ট আসন ও মুদ্রা।

———————————————————
[Images: from internet]

পর্ব: [১০০][**][১০২]

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |১০০| নিরাময়: যৌন-সমস্যা |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |১০০| নিরাময়: যৌন-সমস্যা |
– রণদীপম বসু

# (১০) যৌন-সমস্যা (Sexual disorderness)

নারী পুরুষের যৌন জীবন বা যৌন প্রণোদনা সম্পর্কিত উদ্ভুত জটিলতাগুলোকেই যৌন সমস্যা হিসেবে চিহ্ণিত করা যেতে পারে। এটা দু’ভাবে হতে পারে- দৈহিক ও মানসিক। সাধারণত যৌন অঙ্গে বা প্রজননতন্ত্রে সৃষ্ট রোগ বা ত্রুটিগুলোই দৈহিক সমস্যা হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়, যাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে যৌন রোগ বলে। এই যৌন সমস্যা দেখা দেয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে-

(০১) যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা বা অসাবধানতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব ও অনিয়ন্ত্রিত যৌন-জীবনযাত্রার কারণে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফ্যাঙ্গাস ইত্যাদি জীবাণুর মাধ্যমে যৌন অঙ্গে বা প্রজননতন্ত্রে রোগ সংক্রমন ঘটতে পারে, যেমন সিফিলিস, গনোরিয়া, এইডস ইত্যাদি।
(০২) যৌন অঙ্গ বা প্রজননতন্ত্রে জন্মগত ত্রুটি থাকা।
(০৩) কোন কারণে পিটুইটারী, থাইরয়েড, অগ্ন্যাশয় বা যৌন গ্রন্থির কর্মক্ষমতা হ্রাস পেলে তা থেকে নিঃসৃত বিশেষ বিশেষ হরমোনের আপেক্ষিক ঘাটতি বা প্রাবল্যের কারণে সৃষ্ট হরমোনজনিত রোগ থেকে যৌন দুর্বলতা বা অক্ষমতা দেখা দিতে পারে।
(০৪) কোনভাবে সৃষ্ট স্নায়ুরোগ বা স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে যৌন প্রণোদনা হ্রাস পেতে পারে।
(০৫) এ ছাড়া অন্য কোন রোগভোগের কারণে দৈহিক বা মানসিক দৌর্বল্যহেতু সাময়িক বা স্থায়ী যৌন অক্ষমতা দেখা দিতে পারে।

রোগ নিরাময়ের উপায়:
যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন ও সাবধান হলে এবং নিয়ন্ত্রিত ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলে জীবাণুঘটিত সংক্রামক যৌনরোগ থেকে দূরে থাকা যায়। একান্তই আক্রান্ত হলে যতদ্রুত সম্ভব অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এসব রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

জন্মগত ত্রুটির লক্ষণ প্রকাশ হওয়া মাত্র ডাক্তার দেখানো জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ চিকিৎসা বা শৈল্যচিকিৎসার মাধ্যমে এই ত্রুটি সারানোর উপায় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রয়েছে।

একইভাবে বিভিন্ন হরমোন গ্রন্থির ত্রুটি বা রোগ চিহ্ণিত করা গেলে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় হরমোন ট্যাবলেট বা ইঞ্জেকশান গ্রহণের মাধ্যমে আজকাল এই হরমোনজনিত সমস্যা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কর্মঠ জীবন যাপন করা সম্ভব। যেমন থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যায় উদ্ভুত বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতার সাথে সৃষ্ট যৌন অক্ষমতা কেটে যায় প্রয়োজনীয় হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে। একইভাবে অগ্ন্যাশয় বা প্যাংক্রীয়াস গ্ল্যান্ডের ত্রুটিপূর্ণতায় সৃষ্ট ডায়াবেটিসের যথাযথ চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যৌনজীবনসহ স্বাভাবিক জীবন যাপনে কোন সমস্যা থাকে না।

স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট যৌন সমস্যার ক্ষেত্রে প্রথমেই স্নায়ুরোগের উৎসটাকে চিহ্ণিত করতে হয়। যে রোগ বা সমস্যার জন্যে সংশ্লিষ্ট স্নায়ুরোগের উৎপত্তি, তা দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেই স্নায়ুরোগের নিরাময়ের সাথে সাথে এ রোগ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। নিয়মিত সুষম খাবার গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে শারীরিক দুর্বলতাজনিত যৌন সমস্যা থেকে দূরে থাকা শুধু অভ্যাসের ব্যাপার।

যোগশাস্ত্রে সুস্থ সুন্দর ও আনন্দময় যৌনজীবন পালনের নিমিত্তে কিছু আসন ও মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রভাতে সহজ বস্তিক্রিয়া সেরে কিছুক্ষণ খালি হাতে ব্যায়াম ও সুর্য-নমস্কার ব্যায়াম করতে হবে। এরপর সামর্থ্য অনুযাযী কিছু যৌগিক ব্যায়াম অভ্যাস করতে হবে। যেমন- গোমুখাসন, ভদ্রাসন (বদ্ধ-কোণাসন), মহাবন্ধমুদ্রা, মহামুদ্রা, শক্তিচালনীমুদ্রা, সর্বাঙ্গাসনমৎস্যাসন ইত্যাদি যথানিয়মে নিয়মিত অভ্যাস করলে অচিরেই অস্বাভাবিক বীর্যক্ষয়ের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে সুস্থ দেহ ও মনে দুশ্চিন্তাহীন আনন্দময় যৌনজীবন কাটানো যায়।

অবিবাহিত কিশোর ও যুবকদের দেহে-মনে যখন তখন জেগে ওঠা কামভাব নিয়ন্ত্রণের উপায়ও যোগশাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। যখনই কামভাব জাগবে তখনই তার গোমুখাসনে উপবেশন করলে কামভাব একেবারে দূর হয়ে যাবে। যোগশাস্ত্রানুযায়ী কামোত্তেজনা দমনের সর্বাপেক্ষা সহজ ও শ্রেষ্ঠ উপায় হলো- মহাবন্ধমুদ্রা অভ্যাসের পরই মহামুদ্রা অভ্যাস করা। যখনই মনে কামভাব জাগবে তখনই যদি গুহ্যদ্বার ও তলপেট আকর্ষণ ও বিকর্ষণ করে একবার মহাবন্ধমুদ্রা অভ্যাস করে তার পরই মহামুদ্রা অভ্যাস করা যায়, তাহলে কামরিপু সহজেই দমিত হয়।
[Images: from internet]

(চলবে…)

পর্ব: [৯৯][**][১০১]

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৯| নিরাময়: ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৯| নিরাময়: ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র |
– রণদীপম বসু

# (০৯) ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র (Diabetes)

ডায়াবেটিস কোন ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। এটি একটি বিপাকজনিত রোগ। আমাদের পাকস্থলী সংলগ্ন ঠিক যেখান থেকে ুদ্রান্ত্রের শুরু সেখানে অগ্ন্যাশয় বা প্যাংক্রীয়াস (Pancreas) নামক একটি গ্রন্থি রয়েছে, যা থেকে ইনসুলিন নামে এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই ইনসুলিন আমাদের গৃহিত খাবার থেকে সৃষ্ট গ্লুকোজকে ভেঙে শরীরের শক্তি উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে লাগাতে সাহায্য করে। কোন কারণে এই ইনসুলিনের অভাব হলে এর সম্পূর্ণ বা আপেক্ষিক ঘাটতির কারণে শরীরে বিপাকজনিত গোলযোগ সৃষ্টি হয়ে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ শরীর আর গ্লুকোজকে কাজে লাগাতে পারে না। ফলে অতিরিক্ত গ্লুকোজ একসময় প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে আসে। এই সামগ্রিক অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলা হয়। এই রোগে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ দীর্ঘস্থায়ীভাবে বেড়ে যায়।

সুস্থ লোকের রক্তরস বা রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ থাকে অভুক্ত অবস্থায় ৬.৪ মিলি মোল-এর কম এবং খাওয়ার দু’ঘণ্টা পর ৭.৮ মিলি মোল-এর কম। কিন্তু অভুক্ত অবস্থায় রক্তের প্লাজমায় গ্লুজোজের পরিমাণ ৭.৮ মিলি মোল বা তার বেশি হলে অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার দু’ঘণ্টা পরে রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসে গ্লুকোজের পরিমাণ ১১.১ মিলি মোল বা তার বেশি হলে তাকে ডায়াবেটিস রোগ হিসেবে সনাক্ত করা হয়। এই ডায়াবেটিস হলে অগ্ন্যাশয় থেকে প্রয়োজনমতো কার্যকরী ইনসুলিন নিঃসরণ হয় না বা এর কার্যকারিতা হ্রাস পায় বলে দেহে শর্করা, আমিষ ও চর্বি জাতীয় খাদ্যের বিপাকও সঠিক হয় না। ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়।

রোগের লক্ষণ:
প্রথম অবস্থায় (১) ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া, (২) বার বার পিপাসা লাগা, (৩) ঘামের পরিমাণ কমে যাওয়া, (৪) মুখে প্রায় সবসময় মিষ্টি স্বাদ অনুভব করা।

রোগ পুরাতন হলে (১) বেশি বেশি ক্ষুধা পাওয়া, (২) যথেষ্ট খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া, (৩) ক্লান্তি ও দুর্বলতা বোধ করা, (৪) মাথা ধরা, (৫) মাথা ঘোরা, (৬) কোষ্ঠকাঠিন্য, (৭) মূত্রাশয়ে জ্বালা করা, (৮) ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়া, (৯) খোশ-পাঁচড়া, ফোঁড়া প্রভৃতি চর্মরোগ দেখা দেওয়া, (১০) চোখে কম দেখা ইত্যাদি।
কোন ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না, ঐ ব্যক্তির মূত্র ও রক্ত পরীক্ষা করে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়।

রোগের কারণ:
যে কেউ যে কোন বয়সে যে কোন সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। এর পেছনে প্রধান কারণই হচ্ছে অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতা হ্রাস। অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ বা অন্যান্য হরমোনের আধিক্য হলে, কিংবা কোন ঔষধ বা রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শে বা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার জটিলতার কারণে অগ্ন্যাশয় আক্রান্ত হয়ে এর কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে তিন শ্রেণীর লোকের ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে-
(ক) বংশে যেমন বাবা-মা বা রক্ত সম্পর্কীয় নিকট আত্মীয়ের ডায়াবেটিস থাকলে, (খ) যাদের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ওজন বেশি এবং (গ) যারা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের কোন কাজ করেন না। এছাড়া যারা সবসময় মানসিক দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন তাদেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশিমাত্রায় থাকে।

রোগ নিরাময়ের উপায়:
সাধারণত ডায়াবেটিস রোগ সহজে সারে না। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এ রোগ খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এবং তা নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রায় স্বাভাবিক কর্মঠ জীবন যাপন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিজের অবস্থা ও রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা ও নিয়ম-নীতি মেনে চলতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা বাঞ্ছনীয়। এটা সম্পূর্ণ বিপাকজনিত রোগ বলে খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে অতি সতর্ক থাকার বিকল্প নেই। সাথে সাথে জীবনধারায় শৃঙ্খলাও অতি আবশ্যক।

ডায়াবেটিস রোগীর শরীরের ওজন বেশি থাকলে তা কমিয়ে এবং ওজন কম থাকলে বাড়িয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে এসে এই স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। চিনিজাত বা মিষ্টি জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। শর্করা জাতীয় খাবার যেমন চাল আটা দিয়ে তৈরি খাবার, মিষ্টি ফল ইত্যাদি কিছুটা হিসাব করে খেতে হবে। আঁশ জাতীয় খাবার যেমন ডাল, শাক-সবজী, টক ফল ইত্যাদি বেশি বেশি খেতে হবে। সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার যেমন ঘি, মাখন, চর্বি, ডালডা, মাংস ইত্যাদি খাবারের বদলে অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার যেমন সয়াবিন তেল, সরিষার তেল ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ তেল এবং সব ধরনের মাছ খাওয়া অভ্যাস করতে হবে।

চিকিৎসকের নির্দেশিত পরিমাণের বাইরে ক্যালরীবহুল খাবার খাওয়া যাবে না। খাবার নির্দিষ্ট সময়ে খেতে হবে এবং কোন বেলায় খাবার বাদ দেয়া বা আজ কম কাল বেশি এভাবে খাবার খাওয়া উচিত হবে না। তিতা জাতীয় খাবার যেমন নিয়মিত করলার রস খেলে ডায়াবেটিস রোগের প্রকোপ কম হতে পারে।

জীবনধারায় শৃঙ্খলা না মানলে ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। তখন রক্তের প্রয়োজনীয় ইনসুলিন-সাম্যতা ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসক নির্দেশিত পরিমাণে ইনসুলিন ইঞ্জেকশান গ্রহণের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে এ-সবই সাময়িক ব্যবস্থা। সর্বক্ষেত্রে নিয়মিত ও পরিমাণমতো সুষম খাবার ও প্রয়োজনীয় ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রম এই রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ে অত্যাবশ্যক বিবেচনা করা হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না রাখলে এর উপজাত হিসেবে হৃদরোগসহ শরীরে বহু রোগের সৃষ্টি হতে পারে যা রোগীর জন্য অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ একান্ত বাঞ্ছনীয়।

যোগশাস্ত্রে এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করতে প্রাচীন মুনিঋষিদের প্রবর্তিত কিছু নিয়ম ও যোগব্যায়াম অভ্যাসের উল্লেখ রয়েছে। যেমন-

ভাত বা রুটির বদলে কাঁচকলা সিদ্ধ, মানকচু বা ওল সিদ্ধ খাওয়া। অম্লধর্মী আমিষ জাতীয় খাদ্য, যথা- মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি গ্রহণ না করে ক্ষারধর্মী আমিষ জাতীয় খাদ্য, যথা- দই, ছানা, নারিকেল ইত্যাদি গ্রহণ করা। নিম গাছের বাকল অথবা তেজপাতা ভেজানো জল খালিপেটে পান করলে বহুমূত্র রোগীরা দ্রুত ফল লাভ করে। প্রথম দিন এক গ্লাস জলে ১টি তেজপাতা, পরের দিন ২টি, এভাবে ২১ দিনের দিন ২১টি তেজপাতাসহ জল পান করতে হবে। পুনরায় ১টি করে কমিয়ে ২১ দিনের দিন ১টি তেজপাতা ভেজানো জল পান করতে হয়। অর্থাৎ মোট ৪২ দিন পান করতে হয়। পাশাপাশি কিছু যোগব্যায়াম অভ্যাস করা প্রয়োজন-


এই যোগ ব্যায়ামগুলো অভ্যাসের পূর্বে কিছু খালি হাতে ব্যায়াম বা সূর্য-নমস্কার ব্যায়াম অভ্যাস করে নিলে আরেকটু দ্রুত ফললাভ হয়।

উপরোক্ত খাদ্যতালিকা থেকে নিজ অভিরুচিমতে প্রস্তুত একটা নিয়ন্ত্রিত ও সুষম খাদ্যতালিকা অনুযায়ী খাদ্যগ্রহণের সাথে সাথে নিয়মিত ২/৩ মাস উল্লেখিত যৌগিক ব্যায়ামগুলো অভ্যাস করলে প্লীহা, যকৃত ও অগ্ন্যাশয় সুস্থ ও সক্রিয় হয়ে ওঠলে আমিষ ও শ্বেতসাত জাতীয় খাদ্য থেকে গ্লুকোজ তৈরি করে যকৃতে গ্লাইকোজেন রূপে সঞ্চিত করে রাখে এবং এই গ্লাইকোজেন দৈহিক নানা প্রয়োজনে যথাসময়ে ব্যয়িত হয়ে রোগীকে রোগমুক্ত করতে সহায়তা করে।

এক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে অবশ্যই পরামর্শ করে নেয়া উচিত। তাতে রোগমুক্তির জন্য তা আরো সহায়ক হবে।
[Images: from internet]

(চলবে…)

পর্ব: [৯৮][**][১০০]

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৮| নিরাময়: হাঁপানি বা অ্যাজমা |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৮| নিরাময়: হাঁপানি বা অ্যাজমা |
– রণদীপম বসু

# (০৮) হাঁপানি বা অ্যাজমা (Asthma)

স্বাভাবিকভাবে আমরা যে শ্বাস গ্রহণ করি তা শ্বাসনালীর মধ্য দিয়ে ফুসফুসে যায়। কিন্তু কোন কারণে শ্বাসনালী সঙ্কুচিত হয়ে এলে বা যথানিয়মে প্রসারিত হতে না পারলে স্বাভাবিক নিয়মে শ্বাস নেয়া বা ছাড়া সম্ভব হয় না, ফলে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয় এবং বুকে হাঁপ ধরে যায়। এই অবস্থাকেই হাঁপানি বা শ্বাস-রোগ বলে। সাধারণ দৃষ্টিতে এ রোগ জীবনসংশয়কারী না হলেও তা মানুষের জীবনীশক্তিকে তিলে তিলে নষ্ট করে দেয এবং জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।

সাধারণত শৈশবে ৪/৫ বছর বয়সে এ রোগ হলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ১৩/১৪ বছর বয়সের দিকে তা সেরে যায় এবং প্রৌঢ়ত্বের শেষে অনেক সময় তা আবার ফিরে আসতেও দেখা যায়। তবে বয়সকালে যাদের হাঁপানি দেখা দেয়, সহজে ছাড়তে চায় না, তা নিয়ন্ত্রণ করেই চলতে হয়।

রোগের লক্ষণ:
হাঁপানিতে আক্রান্ত হলে রোগীর শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয় এবং বুকে হাঁপ ধরে গলা দিয়ে একটা সাঁ সাঁ শব্দ হতে থাকে। বুকে কান পাতলে ভেতরে চিঁ চিঁ শব্দ শোনা যায়। বায়ুর সমুদ্রে ডুবে বাস করেও নিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এক মুঠ বাতাস নেয়ার তাগিদে রোগীর চোখে মুখে যে অসহায় আর্তি বা আকুতি ফুটে ওঠে, সে দৃশ্য সত্যিই ভয়ঙ্কর। যেকোন সময় রোগীকে এ রোগ আক্রমণ করতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শেষরাতে এ রোগের আক্রমণ ঘটে থাকে এবং ঘুম ভাঙার সাথে প্রবল হয়ে ওঠে। ঠাণ্ডা ঋতু বা আবহাওয়ায় এ রোগ বৃদ্ধি পায়। ক্ষুধামন্দা, অজীর্ণ ও অবসাদ হাঁপানির পূর্ব লক্ষণ।

রোগের কারণ:
কোন কারণে শ্বাসনালীতে শ্লেষ্মা জমলে বা স্নায়ুর দুর্বলতার জন্য শ্বাসনালী ঠিকমতো সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হতে না পারলে হাঁপানি রোগ দেখা দেয়। দীর্ঘদিন দেহে বিশুদ্ধ রক্তের অভাবে ফুসফুস ও স্নায়ুগ্রন্থি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারলে প্রয়োজনমতো শ্বাসনালী প্রসারিত হতে পারে না। বংশানুক্রমেও জেনেটিক ফ্যাক্টর হিসেবে এ রোগ হতে দেখা যায়। আবার জন্ম থেকে বা আঘাতজনিত কারণে শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত বা নাসারন্ধ্রের দেয়াল বিকৃত হলে কিংবা নাকের দু’পাশের সাইনাসে দীর্ঘদিন সর্দি জমে থাকলেও হাঁপানি হয়ে থাকে। এছাড়া কোন কারণে শ্বাসনালী হঠাৎ সংবেদনশীল হয়ে অ্যাকিউট বা হঠাৎ হাঁপানি হতে পারে। হাঁপানি কেন হয় তার সঠিক কারণ আজও নিশ্চিত হতে না পারলেও ডাক্তারদের মতে এলার্জিই এই রোগের প্রধান কারণ। এই এলার্জি বিভিন্ন ধরনের পদার্থ থেকে হতে পারে, যেমন ফুলের পরাগ বা রেণু, পতঙ্গ, ছত্রাক, ওষুধের প্রতিক্রিয়া, রাসায়নিক পদার্থ, ধোঁয়া বা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী গ্যাস, খাদ্য হিসেবে ডিম, চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া, বেগুন ইত্যাদি। অতিরিক্ত পরিশ্রমে কারো কারো হাঁপানি আসতে দেখা যায়। শ্বাসনালীতে জীবাণুর আক্রমণ থেকে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা বা ফুসফুসে জীবাণুর আক্রমণে কার্ডিয়াক অ্যাজমা ইত্যাদি হয়ে থাকে। হৃদরোগও অ্যাজমার অন্যতম কারণ।

রোগ নিরাময়ের উপায়:
জন্মসূত্রে না হয়ে থাকলে হাঁপানির লক্ষণ প্রকাশ পেলেই প্রথমে রোগের উৎস বা কারণ জেনে নিতে হবে- তা কি শ্লেষ্মা, না ফুসফুস, না কি স্নায়ুর দুর্বলতা কিংবা এলার্জি ?

পুরনো শ্লেষ্মা এ রোগের কারণ হলে রোজ সকালে ও সন্ধ্যায় খালিপেটে এক চামচ মধু ও চ্যবনপ্রাশ একসাথে মিশিয়ে এক গ্লাস পাতলা গরম দুধসহ খেতে হবে। ১ তোলা তালমিছরি, একটি তেজপাতা ও একটি লবঙ্গ দু’কাপ পরিমাণ জলে গরম করে দু’বেলা খেলে সমস্ত পুরনো সর্দি উঠে আসবে। হাঁপানির টান বেশি থাকলে একদিন উপবাস করলে টান প্রশমিত হয়। উপবাসের সময় ঠাণ্ডা পানির পরিবর্তে ঈষদোষ্ণ গরম জলে লেবুর রস মিশিয়ে অল্প অল্প করে পান করতে হবে। এ সময় রোগীর বিশ্রাম নেয়া উচিত। উপবাসের পর সতর্কতার সাথে আহার করতে হয়। প্রয়োজনমতো দিনে ৩/৪ বার অল্প অল্প আহার করা উচিত।

যদি ফুসফুস ও সংলগ্ন স্নায়ুজালের দুর্বলতার জন্য হাঁপানি রোগ হয় তবে এই দুর্বলতার কারণগুলো দূর করতে হবে। অনেক কারণে এগুলো দুর্বল হতে পারে। যোগশাস্ত্রকারদের মতে খাবার ঠিকমতো হজম না হলে কোষ্ঠবদ্ধতা ও অজীর্ণ ইত্যাদি রোগের মাধ্যমে বিষাক্ত গ্যাস ও এ্যাসিড প্রভৃতি জমে রক্তের সাথে মিশে দেহের অভ্যন্তরস্থ দেহযন্ত্রকে অকেজো করতে শুরু করে। ফলে ফুসফুস ও স্নায়ুজাল ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এতে শরীরের কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস শরীর থেকে প্রয়োজনমতো বের হয়ে যেতে না পেরে দেহযন্ত্রকে আরো দুর্বল ও আংশিক অক্ষম করে দেয়। তার ফলে দেহে কেবল হাঁপানি নয়, আরও অনেক মারাত্মক রোগও আক্রমণ করতে পারে।

তাই হাঁপানি রোগীদের আহার ও পথ্য বিষয়ে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন হয়। এমন কোন খাবার খাওয়া উচিত নয় যাতে হজমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। রোগ নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত আমিষ, শর্করা ও চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করা উচিত। হাঁপানি রোগীর খাদ্যে প্রচুর শাকসবজি, ফল, মধু ও দুধ থাকা প্রয়োজন। তেল, ঘি, মাখন, ডিম, মাংস, তৈলযুক্ত মাছ, মশলা ইত্যাদি এই রোগে ক্ষতিকর। ক্ষারধর্মী খাবার বেশি খাওয়া উচিত। কখনো ভরপেট খাওয়া উচিত নয় এবং কোষ্ঠবদ্ধতা যাতে না আসে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কোষ্ঠবদ্ধতা থাকলে রাতে খাবার পর শোবার আগে ৩/৪ চামচ ইসবগুলের ভূষি পানিতে বা দুধে গুলে খেয়ে শুতে হবে। পরদিন প্রাতে ঘুম থেকে উঠে লেবু মিশ্রিত এক গ্লাস গরম জল পান করে শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ভ্রমণ-প্রাণায়াম, উড্ডীয়ান বা অগ্নিসার অভ্যাস করলে কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আক্রান্ত অবস্থায় হাঁপানি রোগীর দৌড়াদৌড়ি লাফালাফি ও খেলাধূলা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রথম প্রথম হাঁপানি রোগী প্রথম দুই সপ্তাহ প্রাতঃকৃত সেরে মুক্তস্থানে স্বাভাবিক দম নিতে নিতে ও ছাড়তে ছাড়তে বেড়াবেন। বিকেলেও একইভাবে তা-ই করবেন।

তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃক্রিয়া সেরে মুক্তস্থানে পবনমুক্তাসন, অর্ধশলভাসন, ভুজঙ্গাসন, বিপরীতকরণী বা সর্বাঙ্গাসনউড্ডীয়ান অভ্যাস করবেন। একমাস পর থেকে এ আসন ও মুদ্রাগুলোর সাথে যোগমুদ্রা, অর্ধকূর্মাসন, মৎস্যাসনধনুরাসন অভ্যাস করবেন। তবে আসন ও মুদ্রাগুলো প্রথম প্রথম ১৫ সেকেন্ড অভ্যাসের পর ১৫ সেকেন্ড শবাসন এভাবে অভ্যাস করে করে অভ্যস্ত হয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনানুযায়ী সময় বাড়াতে পারেন।

এসব যৌগিক আসন ও মুদ্রার সাথে হাঁপানি রোগীরা একটি শ্বাস-ব্যায়াম করবেন। রোদ বাড়লে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা পদ্মাসনে বসে বা শিরদাঁড়া সোজা করে স্বাচ্ছন্দ্য অনুযাযী বসে হাঁ করে যতোটা সম্ভব দম টেনে আস্তে আস্তে ফুসফুসে নিয়ে ২সেঃ থেকে ৫সেঃ দম বন্ধ করে থাকতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে নাক দিয়ে দম ছাড়তে হবে। এভাবে দশ থেকে পনের মিনিট শ্বাস-ব্যায়ামটি করতে হবে। বিকেলে রোদের তেজ থাকতে থাকতে একইভাবে শ্বাস-ব্যায়ামটি দশ-পনের মিনিট অভ্যাস করতে হবে। তবে হাঁপানি রোগীদের এই শ্বাস-ব্যায়াম কখনোই ঠাণ্ডা বাতাসে করা উচিত নয়। এবং হাঁপানি রোগীদের কখনো বেশি ঠাণ্ডা পানিতে স্নান করা ঠিক নয়। রোদে জল রেখে বা উনুনে গরম করে সেই উষ্ণ জলে স্নান করলে উপকার পাওয়া যায়।

এভাবে বিভিন্ন আসন অভ্যাস এবং পথ্য ও নিয়মগুলো পালন করলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যদি এ রোগ জীবাণুঘটিত হয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করে জীবাণুমুক্ত হতে হবে। আর যদি এলার্জিঘটিত হয় তবে এলার্জির উৎসটাকে পরিহার করে চলতে হবে। না হলে কোন ব্যায়াম বা অনুষঙ্গেও কোন কাজ হবে না। তবে সর্বাবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
[Images: from internet]

(চলবে…)

পর্ব: [৯৭][**][৯৯]

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৭| নিরাময়: স্নায়ুরোগ |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৭| নিরাময়: স্নায়ুরোগ |
– রণদীপম বসু

# (০৭) স্নায়ুরোগ (Nervous disorderness | Nervous-breakdown):

স্নায়ুরোগ বা স্নায়বিক দুর্বলতা একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগ সংক্রামক নয় বা এতে রোগীর মৃত্যু না হলেও একে অবহেলা করার কোন উপায় নেই এবং তা উচিতও নয়। কেননা এতে রোগীর আত্মশক্তি ক্রমে ক্ষয় হতে হতে রোগী দিনে দিনে অবশেষে অকর্মণ্য হয়ে যায়।

আমাদের স্নায়ুগুলো অত্যন্ত সুক্ষ্ম রজ্জু বা তারের মতো গোটা দেহে প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কোষে কোষে জাল-বিস্তার করে ছড়িয়ে আছে। এর মূলকেন্দ্র হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কে। সেখান থেকে সুষুম্নাকাণ্ড বা স্পাইনাল কর্ডের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে শাখায়-প্রশাখায় ভাগ হতে হতে গোটা দেহে ছড়িয়ে গেছে। সংবাদ আদান-প্রদান করাই এদের কাজ। মস্তিষ্কের আদেশ-নির্দেশ পরিচালনার মাধ্যমে তা আমাদের দেহযন্ত্রকে চালিত করে থাকে। দেহের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম, ক্রোধ, জ্বালা-যন্ত্রণা ইত্যাদি সব ধরনের বৃত্তি, প্রবৃত্তি ও শারীরিক সার্বিক অনুভূতির মূলেই রয়েছে এই স্নায়বিক সঞ্চালন। আর সুস্থ স্নায়বিক সঞ্চালনের উপরে নির্ভর করে আমাদের দৈহিক সুস্থতা এবং সার্বিক কর্মকাণ্ড। এই কাজে স্নায়ুগুলোকে সারাক্ষণই কর্মব্যস্ত থাকতে হয় বলে কেবল রাতে ঘুমের সময় স্নায়ুগুলো বিশ্রামের সুযোগ পায়। তাতে ক্লান্তিমুক্ত হয়ে এরা প্রয়োজনীয় সজীবতা ফিরে পায় এবং আবারো নিজ দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু বিশেষ কোন কারণে স্নায়ুগুলো বিশ্রামের অভাবে দুর্বল ও অবসন্ন হয়ে পড়লে বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক জটিলতা এসে ভর করে এবং অদ্ভুত সব রোগের বা উপসর্গের সৃষ্টি করে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন রোগ যেমন অজীর্ণ, অম্ল, রক্তস্বল্পতা, কোষ্ঠবদ্ধতা, অসংযমী কার্য়-কারণ বা বিভিন্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণেও স্নায়ু দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

স্নায়ুরোগের লক্ষণ:
স্মৃতি বিপর্যয়, বুদ্ধিহীনতা, বিকলাঙ্গতা, বলপ্রয়োগে অক্ষমতা, সামান্য কারণে ধৈর্য্যচ্যুতি বা রেগে যাওয়া, মুর্ছা যাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। যে স্নায়ুজালের বিশেষ ভূমিকার কারণে আমাদের দেহ পরিচালিত হচ্ছে, সেই স্নায়ুজালের একটি মাত্র স্নায়ুর বিপর্যয়ের জন্যে দেহের যেকোন অংশ অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাই এ রোগ প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে কোন ধরনের অবহেলা না করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। শুরুতেই সতর্ক হলে এ রোগ সহজে নিরাময় সম্ভব।

স্নায়ুরোগের কারণ:
দৈহিক বা মানসিক শ্রম অনুযায়ী দীর্ঘদিন খাদ্য বা বিশ্রামের অভাব, দীর্ঘকালের অতি ব্যায়াম, দীর্ঘদিনের রাত্রি-জাগরণ, অসংযমী জীবন-যাপন, রক্তাল্পতা বা দেহে বিশুদ্ধ রক্তের অভাব, দুশ্চিন্তা বা মনের উদ্বেগ ইচ্ছাকে জোর করে দীর্ঘদিন চেপে রাখা এবং দীর্ঘদিন অন্য কোন রোগভোগ ইত্যাদি এ রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

রোগ নিরাময়ের উপায়:
দেহে-মনে স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিলেই যে কারণের জন্য এ রোগ হয়েছে তা খুঁজে বের করে দ্রুত সেই কারণ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিলেই এ রোগ দূর করা সহজ হয়ে যায়। যেহেতু স্নায়ুরোগ নিজে কোন রোগ নয়, মূলত অন্য কোন রোগ বা কারণের উপজাত, তাই স্নায়ুরোগের উৎস-কারণের লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়াই হচ্ছে এ রোগ নিরাময়ের সঠিক উপায়। অতিরিক্ত কায়িক শ্রমের কারণে এ রোগ হলে পরিমিত পুষ্টিকর আহার ও কয়েকদিন প্রয়োজনীয় পূর্ণ বিশ্রাম নিলে এ রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। আবার যদি রক্তাল্পতা বা বিশুদ্ধ রক্তের অভাবের জন্য এ রোগ হয়ে থাকে, তাহলে রোগীর মধ্যে অম্ল বা অজীর্ণ বা কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা তারল্য রোগের লক্ষণ দেখা যাবে। সে ক্ষেত্রে সেই রোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেই সেই রোগ দূর হওয়ার পাশাপাশি স্নায়বিক দুর্বলতাও কেটে যাবে। পরিমিত পুষ্টিকর সহজপাচ্য খাদ্যগ্রহণ ও সকালে ঘুম থেকে উঠে এক-দু’গ্লাস পানি পান করে পবন-মুক্তাসন, বিপরীতকরণী মুদ্রা, অর্ধ-কুর্মাসনপদ-হস্তাসন অভ্যাস করতে হবে। এরপর জলখাবারের আধঘণ্টা পর জানুশিরাসন, অর্ধ-চক্রাসন, সর্বাঙ্গাসনমৎস্যাসন করতে হবে। বিকেলে মুক্তস্থানে ভ্রমণ-প্রাণায়াম, রাতে শয্যাগ্রহণের পূর্বে দশ মিনিট বজ্রাসন অভ্যাস এবং সপ্তাহে একদিন পূর্ণ উপবাস করলে এ রোগ হতে নিরাময় পাওয়া যাবে। যদি দীর্ঘদিনের চেপে রাখা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে, তাহলে রোগীর মধ্যে উচ্চ-রক্তচাপ বা অম্লের লক্ষণ প্রকাশ পাবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবে উৎস-রোগের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থার মাধ্যমে স্নায়ুরোগ দূর করার ব্যবস্থা না নিলে এ রোগ একসময় পুরোপুরি স্নায়ুবৈকল্যে রূপ নেয়াও অসম্ভব নয়। সর্বক্ষেত্রে রিলাক্সেশন বা শিথিলায়নের অন্যতম সর্বোত্তম প্রক্রিয়া হিসেবে যথাযথ শবাসন অভ্যাস অনেক জটিলতার নিরসন করতে সক্ষম বলে যোগশাস্ত্রীরা মনে করে থাকেন। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, স্নায়বিক দুর্বলতা দূর করার প্রধান শক্তিই হচ্ছে মনের শক্তি। ধৈর্য্য ও নিরবচ্ছিন্ন আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যমের মাধ্যমে অনায়াসে এসব রোগ থেকে সফলভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
[Images: from internet]

(চলবে…)

পর্ব: [৯৬][**][৯৮]

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৬| নিরাময়: উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে |৯৬| নিরাময়: উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ |
– রণদীপম বসু

# (০৬) রক্তচাপ (Blood-pressure):

চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী রক্তচাপ দু-ধরনের, উচ্চ-রক্তচাপ (High blood-pressure বা Highper-tension)ও স্বল্প বা নিম্ন-রক্তচাপ (Low blood-pressure বা Highpo-tension)।

আমাদের দেহের রক্ত সংবহন বা সঞ্চালনে হৃদপিণ্ডের ভূমিকা প্রধান। হৃদপিণ্ডের কাজই হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন পাম্পের সাহায্যে সঙ্কুচিত-প্রসারিত হয়ে চাপ প্রয়োগ করে রক্তকে সারাদেহে ধমনী ও শিরা-উপশিরা তথা রক্তনালীর মাধ্যমে দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে রক্তের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করা। হৃদপিণ্ড সঙ্কুচিত হয়ে তার ভেতরের রক্তকে চাপ দিয়ে রক্তবাহী নালীর মধ্যে দিয়ে বের করে দেহে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়াকে বলে সঙ্কোচন বা সিস্টল (Systol) এবং প্রসারিত হয়ে রক্ত টেনে ভেতরে নেয়াকে বলে প্রসারণ বা ডায়াস্টল (Diastol)। হৃদপিণ্ড যখন পাম্প করে রক্ত সমস্ত দেহে ছড়িয়ে দেয় তখন তার পর্যায়ক্রমিক সিস্টল-ডায়াস্টল প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং হৃদপিণ্ডের এই পর্যাক্রমিক চাপকে বলে সিস্টলিক প্রেসার ও ডায়াস্টলিক প্রেসার। সিস্টলিক থেকে ডায়াস্টলিক প্রেসার সাধারণত ৪০-এর মত কম হয়। সুস্থ মানব-দেহে সাধারণত সিস্টলিক প্রেসার থাকে ১২০ মিলিমিটার এবং ডায়াস্টলিক প্রেসার ৮০ মিলিমিটার। ক্ষেত্র বিশেষে এই মান ১০ কম-বেশি হতে পারে। এটাকেই স্বাভাবিক রক্তচাপ বলা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে তাকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উভয় ক্ষেত্রে এই চাপ বেড়ে গেলে তাকে উচ্চ-রক্তচাপ এবং কমে গেলে নিম্ন-রক্তচাপ হিসেবে চিহ্ণিত করা হয়। তবে উচ্চ-রক্তচাপকেই বেশি বিপজ্জনক মনে করা হয়।

রক্তচাপ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম অবস্থায় শারীরিক দুর্বলতা, মাথায় ভারবোধ, মাথাধরা, মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করা, কখনো কখনো দম নিতে ও ছাড়তে কষ্টবোধ হওয়া, কানে সোঁ সোঁ আওয়াজ শোনা, চোখে টান টান ভাব, দন্তপাটির আলগা আলগাভাব, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ও ঘন ঘন প্রস্রারের বেগ হওয়া ইত্যাদি সবক’টি অথবা যেকোন দু’তিনটি লক্ষণ অনুভব করে থাকেন।

(৬.১) উচ্চ-রক্তচাপ

রক্তের স্বাভাবিক চাপ (সিস্টল ১২০ ও ডায়াস্টল ৮০) থেকে মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে বলে উচ্চ-রক্তচাপ।

রক্তচাপ বৃদ্ধি রোগের লক্ষণ:
রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে মাথায় যন্ত্রণা, কখনো ঘাড়ে ব্যথা এবং শরীর অস্থির হয়ে কাঁপতে থাকে। কখনোবা কানের মধ্যে সোঁ সোঁ আওয়াজ হয়। চিৎকার বা গণ্ডগোল একেবারে সহ্য হয় না এবং অল্পতে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেন। রাতে ভালো ঘুম হয় না, বাঁদিকে কাৎ হয়ে শুতে কষ্ট হয়। কখনো কখনো রোগী জ্ঞান পর্যন্ত হারাতে পারেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে রক্তচাপ ১৫৫ মিলিমিটারের বেশি হলে এই রোগে আক্রান্ত রোগীকেই হৃদরোগী বলা হয়।

রক্তচাপ বৃদ্ধির কারণ:
শরীর সুরক্ষা ও পুষ্টি বৃদ্ধির জন্য যতোটা প্রোটিন জাতীয় খাদ্য দরকার এবং শরীরের তাপ ও কর্মশক্তি ঠিক রাখার জন্য যতোটা চর্বি ও শর্করা জাতীয় খাদ্যগ্রহণ দরকার, দীর্ঘকাল ধরে তার চেয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করা এ রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। আমাদের দেহে প্রোটিন সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা না থাকায় এসব অতিরিক্ত মাত্রায় গৃহিত খাদ্যের প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রোটিনকে দেহ থেকে বের করে দিতে দেহযন্ত্রগুলোর যে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, তাতে একটা সময়ে এসে দেহযন্ত্রগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়তে থাকে। ফলে পরে আর ঠিকভাবে তা করতে পারে না বলে দেহে থেকে যাওয়া অতিরিক্ত প্রোটিন অ্যামোনিয়াজাত উপাদানে পরিবর্তিত হয়ে রক্তে মিশে গিয়ে ধমনী ও শিরা-উপশিরার নমনীয়তা নষ্ট করে দেয়। ফলে হৃৎপিণ্ড সহজে দেহে রক্ত আদান-প্রদান করতে পারে না। আবার আবার অতিরিক্ত গৃহিত চর্বি জাতীয় উপাদান রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ায় রক্তের চর্বি-ঘনত্ব যেমন বেড়ে যায়, এইভাবে এই কোলেস্টেরল ধমনী ও শিরা-উপশিরার দেয়ালে জমে রক্ত চলাচলের পথ সরু করে দেয়। এ অবস্থায় হৃদপিণ্ডকে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে দেহে রক্ত আদান-প্রদান করতে হয়। এই অতিরিক্ত চাপকেই রক্তচাপ বৃদ্ধি বলা হয়। এই অতিরিক্ত চাপ বেশি বৃদ্ধি পেলেই রক্তবাহী নালী যেকোন সময় যেকোন জায়গায় ফেটে বা ছিঁড়ে যেকোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

এই দুর্ঘটনা বুকে হলে রোগী বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন, গা দিয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। এই অবস্থাকে বলে হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack)। আর তা যদি মস্তিষ্কে ঘটে তবে তাকে বলা হয় করোনারী বা সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস। মস্তিষ্ক দেহের স্নায়ুজাল নিয়ন্ত্রণ করে বলে এরকম দুর্ঘটনায় দেহের আংশিক বা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত (Paralysis) কিংবা মৃত্যুও ঘটতে পারে।

রক্তচাপবৃদ্ধি রোগ নিরাময়ের উপায়:
উচ্চ-রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাদ্যগ্রহণে খুবই সচেতন ও সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে। চর্বিসমৃদ্ধ আমিষ জাতীয় খাদ্যগ্রহণ একেবারে বন্ধ রাখাই উত্তম। ভাত বা রুটি অল্প পরিমাণে খাবেন, কিন্তু মাখন, ঘি বা যে কোন চর্বিজাতীয় উপাদান পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। টাটকা শাকসবজি, মাখন-তোলা দুধ, ঘোল বা মাঠা, পাকা বা শুকনো ফল এই রোগের উৎকৃষ্ট খাবার। রোগী অতিরিক্ত মোটা হলে দুধ খাওয়া যাবে না। চিনির বদলে গুড় বা মধু খাওয়া যেতে পারে। এ রোগে যতটা সম্ভব লবণ কম খেতে হবে এবং কাঁচা-লবণ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। ক্ষারজাতীয় সহজপাচ্য খাদ্যগ্রহণ করতে হবে, বেশি তেল-মশলাযুক্ত খাবার ও ডিমের কুসুম খাওয়া যাবে না। সরিষার তেল বা অপরিশোধিত রেপসিড তেল খাওয়া এই রোগীর জন্য ক্ষতিকারক। হৃদরোগীদের জন্য অল্প পরিমাণে সূর্যমুখী, বাদাম বা নারকেল তেল দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়াই উত্তম। মাঝে মাঝে বা সপ্তাহে একদিন পূর্ণ উপবাস থাকা এ রোগীদের জন্য অত্যন্ত ফলদায়ক। উপবাসের সময়টাতে লেবুর রস মিশ্রিত পানি ও ঘোল বা মাঠা পান করা যেতে পারে।

হৃদরোগীদের জন্য ক্রোধ সংবরণ করা একান্তই প্রয়োজন। জোরে কথা না বলা, মনে কোন দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ ও উত্তেজনা পোষে না রেখে জীবনকে সহজভাবে দেখা এবং উপযুক্ত বিশ্রাম এ রোগীদের সবসময় প্রয়োজন। প্রয়োজনমতো বিশ্রাম না নিয়ে বেশি দৈহিক বা মানসিক শ্রমের কাজ করা কিছুতেই উচিৎ নয়। ধুমপান ও মাদক-দ্রব্য গ্রহণ অবশ্য বর্জনীয়।

এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে থাকা উচিৎ এবং ডাক্তারের নির্দেশানুযায়ী ঔষধ সেবন করাও বাঞ্ছনীয়। এর পাশাপাশি কিছু যৌগিক ব্যায়াম ও মুদ্রা অভ্যাস করলে এই রোগ সহজে নিরাময় হয়।

রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি অবস্থায় সকালে ও বিকেলে মুক্তস্থানে পনের মিনিট থেকে আধঘণ্টা ভ্রমণ-প্রাণায়াম অভ্যাসের পর ফিরে এসে শবাসন করতে হবে।

রোগের প্রকোপ কিছুটা কমে এলে সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি পান করে বস্তিক্রিয়া বা প্রাতঃক্রিয়াদি সেরে কিছুক্ষণ শবাসন করবেন। এরপর বজ্রাসন, অর্ধশলভাসন, যোগমুদ্রা, অর্ধ-চন্দ্রাসন ভ্রমণ-প্রাণায়াম করবেন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, উচ্চ-রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীর মাথা নিচে করে কোন আসন অভ্যাস করা উচিত নয়। তাঁরা কখনও শীর্ষাসন, শশঙ্গাসন, পদহস্তাসন, হলাসন, মযূরাসন, মৎস্যাসন এবং উড্ডীয়ানবিপরীতকরণী মুদ্রা অভ্যাস করবেন না।

রোগ কমে এলে জানুশিরাসন, অর্ধ-কুর্মাসন, অর্ধ-চক্রাসনপদ্মাসন এবং অগ্নিসার ধৌতি যতটুকু সম্ভব হয় করতে পারেন। তবে সঠিকভাবে শবাসনের প্রয়োজনীয় অভ্যাস সবচাইতে কার্যকর প্রক্রিয়া হিসেবে রক্তচাপ রোগীদের জন্য অবশ্যকরণীয় একটি রিলাক্স বা বিশ্রাম প্রক্রিয়া হিসেবে নিয়মিত চর্চায় রাখা উচিত।

(৬.২) নিম্ন-রক্তচাপ

চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী দেহে রক্তের চাপ ১১০ মিলিমিটারের কম হলে তাকে স্বল্প বা নিম্ন-রক্তচাপ বলা হয়।

নিম্ন-রক্তচাপ রোগের লক্ষণ:
রক্তচাপ কমে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তির কানের ভিতর সোঁ সোঁ শব্দ হয়, মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে, এমনকি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে রোগী কিছুক্ষণের জন্য অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন। সুনিদ্রা হয় না, বাতে বার বার প্রস্রাবের বেগ হয় এবং ঘুম ভেঙে যায়। বাঁ পাশে কাৎ হয়ে শুতে কষ্ট হয়। কোন কাজে উৎসাহ থাকে না এবং অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে যান তাঁরা।

রক্তচাপ হ্রাসের কারণ:
শরীর সুরক্ষা ও পুষ্টি বৃদ্ধির জন্য যতোটা প্রোটিন জাতীয় খাদ্য দরকার এবং শরীরের তাপ ও কর্মশক্তি ঠিক রাখার জন্য যতোটা চর্বি ও শর্করা জাতীয় খাদ্যগ্রহণ না হলেই নয়, দীর্ঘকাল ধরে তার চেয়ে কম মাত্রায় গ্রহণ করা এ রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া প্লীহা, যকৃৎ, ফুসফুস প্রভৃতির দুর্বলতার জন্য দেহে বিশুদ্ধ রক্তের অভাব, অতিরিক্ত মস্তিষ্ক পরিচালনা ও খাটুনি এবং বিশ্রামের অভাব, কখনো কখনো ন্যূনতম কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও রক্তবাহী ধমনী-শিরার দুর্বলতাও এ রোগের কারণ হতে পারে।

রোগ নিরাময়ের উপায়:
নিম্ন-রক্তচাপসম্পন্ন রোগীদের জন্যেও একই নিয়ম মেনে চলতে হয়, তবে আহার ও বিশ্রামের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হয়। প্রচুর পুষ্টিকর খাবার ও আমিষজাতীয় খাদ্য যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও ছানা একান্ত আবশ্যক।

প্রতিদিন প্রাতে ঘুম থেকে উঠে এক বা দু গ্লাস পানি পান করে প্রাতঃক্রিয়াদি সেরে অগ্নিসার অভ্যাসের পর শবাসন, বজ্রাসন, অর্ধশলভাসন, জানুশিরাসন, অর্ধকুর্মাসন, অর্ধ-চক্রাসন, বিপরীতকরণীমুদ্রা সহজভাবে যতটুকু সম্ভব অভ্যাস করা এবং সন্ধ্যায় ভ্রমণ-প্রাণায়াম করলে ধীরে ধীরে এ রোগ সেরে সুস্থ দেহ ও মনে কর্মঠ ও আনন্দময় জীবনযাপন সহজ হয়ে উঠবে।
[Images: from internet]

(চলবে…)

পর্ব: [৯৫][**][৯৭]