Posts Tagged ‘অনুশীলন’

[Yoga] আপনি কেন ইয়োগা চর্চা করবেন…

————————–
[Yoga] আপনি কেন ইয়োগা চর্চা করবেন… (হাইপার-লিঙ্কড ইয়োগা-সমগ্র)
————————–
রণদীপম বসু
———–

জীবনের বহু বহু ব্যস্ততার মধ্যে আমাদের সময়ই হয় না নিজেকে একটু একান্ত করে দেখার। আমি কে, কী, কেন, কোথায়, কিভাবে, এ প্রশ্নগুলো করার। অথচ সামান্য এ ক’টা প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের সবটুকু রহস্য, ঠিকানা, পরিচয় এবং অস্তিত্বের অনিবার্য শর্তগুলোও। প্রশ্নের এই স্বচ্ছ আয়নায় নিয়ত বদলে যাওয়া জীবনের জলছবিগুলোই আমাদের প্রতিটা যাপন-মুহূর্ত, চলমান জীবন। অসংখ্য সমস্যার গেরোয় জট পাকিয়ে যাওয়া আমাদের জটিল জীবনযাত্রার জট খোলার চাবিটাও যে রয়ে গেছে সেখানেই, কেউ কেউ ঠিকই জানেন, আর অনেকেই তার খোঁজ রাখি না আমরা। এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই এগুতে এগুতে অন্তর্ভেদী দার্শনিক ব্যক্তি যাঁরা, একসময় পৌঁছে যান ঠিকই জীবন ছাড়িয়ে মহাজীবনের বিপুল রহস্যের উজ্জ্বলতম দোরগোড়ায় এক অভূতপূর্ব বিস্ময় নিয়ে ! কিন্তু আমরা যারা অতি সাধারণ জন, খুব সাধারণ দেখার চোখ নিয়েও তারা কি পারি না এই অগুনতি যাপনের ভিড়ে শুধু একটিবার নিজের দিকে ফিরে তাকাতে ? যে আমাকে নিয়ে আমি নিত্যদিনের কর্মশালায় খাচ্ছি-দাচ্ছি-হাসছি-খেলছি-ঘুরছি আর মগ্ন হচ্ছি চিন্তায় বা দুঃশ্চিন্তায়, আমাদের সে ‘আমি’টা দেখতে কেমন, তা কি জানি আমরা ?

আপনি কি জানেন, ঠিক এ মুহূর্তে আপনি কেমন আছেন ? কিংবা কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে ? আসুন না, নিজস্ব আয়নাটার সামনে খুব একান্তে দাঁড়াই একটু ! এবার নিজেকে উন্মোচিত করুন। কেমন দেখাচ্ছে আপনাকে ? ওই আয়নায় যেটা দেখছেন, সেটা আপনার দৈহিক অবয়ব। এই দেহই আমাদের ধারক, বাহক, এবং চালক। এই দেহকে ঘিরে, দেহের মাধ্যমে, এবং দেহের জন্যই আমাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড। মন বলে যে বিমূর্ত ধারণাপিণ্ড কল্পনা করি আমরা, তাও এই দেহনির্ভর। দেহ ছাড়া মন বিকৃত, অসম্পূর্ণ, অচল। দেহের বিনাশ ঘটলে মনের আর কোন অস্তিত্ব নেই, থাকে না। এ জন্যেই প্রাচীন যোগশাস্ত্রেও উক্ত হয়- ‘শরীরমাদ্যং খলু ধর্ম সাধনম’। আপনি যা কিছুই সাধন করতে চান না কেন, এই দেহ ছাড়া গতি নেই, উপায়ও নেই। দৃশ্যমান এই দেহের অস্তিত্ব মানেই বাস্তবে আপনার অস্তিত্ব। দেহ নেই, আপনি নেই। দেহ ছাড়া কেউ থাকে না। দেহত্যাগের পরেও আপনার যে নামটা থেকে যাবে কিছুকাল আপেক্ষিক সময় জুড়ে, তাও এই দেহেরই অবদান। এই দেহ ধারণ করে দেহের মাধ্যমে করে যাওয়া কৃতকর্মই তার আপেক্ষিক স্থায়িত্বের মাধ্যমে আপনার অবর্তমানে আপনার নামটাকে বাঁচিয়ে সম্ভাব্য আপেক্ষিক স্থায়িত্ব দিতে পারে। অতএব, ভালো করে দেখুন- যে দেহটা এ মুহূর্তে ধারণ করে আছেন আপনি।

হতে পারেন আপনি নারী বা পুরুষ, এবার বলুন তো, আয়নায় আপনার যে মানবদেহের অবয়ব দেখছেন, তা কি যেমনটা হওয়ার বা থাকার কথা তেমনই আছে ? চোখ, মুখ, নাক, কান, মুখমণ্ডল, গলা, কাঁধ, বাহু, হাত, বুক, পেট, পিঠ, কোমর, উরু, পা, আঙুল, নিতম্ব, জঙ্ঘা, জননেন্দ্রিয় তথা গোটা দেহকাঠামো সম্পূর্ণ, সুঠাম, সুস্থ, সবল, নিরোগ, অবিকৃত, নিখুঁত, স্বাভাবিক সুন্দর, সক্রিয় ও সাবলীল ? এবার অন্তর্চক্ষু উন্মিলিত করুন। কল্পনা করুন আপনার দেহের ভেতরে অবস্থিত আভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-তন্ত্রিগুলোর কথা। মস্তিষ্ক, স্নায়ুরজ্জু, বিবিধ হরমোন গ্রন্থি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, ধমনী, শিরা-উপশিরা, পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, মাংস-পেশী-অস্থি-মজ্জা-মেরুদণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, রক্তসংবহনতন্ত্র, প্রজননতন্ত্র, বিপাকক্রিয়াদিসহ ইত্যাদি সমূহ সিস্টেম বা প্রক্রিয়া কি সুস্থ, স্বাভাবিক, সক্রিয় ও সাবলীল আছে ? আরো আছে আপনার স্বপ্ন-কল্পনা-ভাবনার বিস্ময়কর বিমূর্ত সেই জগত, যেখানে গ্রন্থিত হয় সৃজনের অবিরল স্রোত। সেও কি শারীরিক ও মানসিক বাধামুক্ত সতেজ উদ্যমে গতিমান ? এসবের উত্তর যদি ‘হাঁ’ হয়, শুধু আমি নই, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সবাই আপনাকে স্যলুট বা অভিবাদন জানাবে। উত্তর যদি হয় ‘না’, তাহলে দেরি নয়, এখনই ভাবুন, এক অসম্পূর্ণ অপভ্রংশ দৈহিক ও মানসিক অস্তিত্ব নিয়ে কতদূর যেতে পারেন আপনি ? আর আপনার এ চলার পথই বা কতোটা নিরাপদ, উদ্বেগহীন, ইচ্ছা-স্বাধীন ?

কথায় বলে- সুস্থ দেহ সুন্দর মন। কথাটা সর্বাংশেই সত্য। দৈহিক সুস্থতার কোন বিকল্প নেই। একটা নিরোগ সুস্থ-সুঠাম সতেজ কর্মঠ দেহের সাথে মানসিক ভ্রান্তিহীন চাপ নিরপেক্ষ সুডোল মনের রাখীবন্ধন ঘটলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবনের নিশ্চয়তা মেলে। কিন্তু আমাদের জীবন-বাস্তবতায় তা কতোটা অর্জন সম্ভব ?

দৈহিক সুস্থতার জন্যে প্রয়োজন সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম। কিন্তু পরিশ্রম পরিকল্পিত না হলে দৈহিক সৌন্দর্য ও সুস্থতা নিশ্চিত হয় না। দেহের প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা না হলে দেহবিন্যাস সুষম ও সুগঠিত হতে পারে না। এজন্যেই দেহের জন্য দরকার হয়ে পড়ে পরিকল্পিত শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের। আমাদের এ নাগরিক সভ্যতায় মাঠ-ঘাট-খোলা জায়গা এখন যেভাবে ধীরে ধীরে কল্পজগতের বস্তু হয়ে ওঠছে তাতে করে শরীরচর্চার পরিসর ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। কিন্তু দেহের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পেশী হাড় অস্থিসন্ধি ও রক্তসংবহনতন্ত্রের পরিমিত সঞ্চালন ও সক্রিয়তা রক্ষার অনন্য মাধ্যম হিসেবে ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম এখানে তুলনাহীন। যোগ-ব্যায়ামের বিভিন্ন আসনগুলো চর্চার জন্য আপনার ঘরের স্বল্পপরিসর মেঝে বা আপনার বিছানাটাই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।

দেহের জ্বালানী হলো খাদ্য। তা পেলেই দেহ তার অভ্যন্তরস্থ বিশেষ বিশেষ দেহযন্ত্রের মাধ্যমে পরিবহন পরিবর্তন রূপান্তর করে নিজেকে সচল ও সবুজ সতেজ বৃক্ষের মতো পল্লবিত করে তোলে। কিন্তু খাওয়ার নামে প্রতিনিয়ত যা গিলছি আমরা তা কি আদৌ খাদ্য ? বিষাক্ত ভেজালের যুগে এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না আর। অতএব আমাদের দেহযন্ত্রের কারখানায় বিষ থেকে অমৃত সৃজনের প্রযুক্তি যতকাল রপ্ত না হবে, ততকাল ক্রমে ক্রমে নিঃসার হয়ে আসা দেহগহ্বরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে সচল ও সক্রিয় রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা না নিয়ে কোন উপায় আছে কি ? তার শ্রেষ্ঠ উপায়ই হচ্ছে ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম। স্নায়ু গ্রন্থি রক্তনালী শিরা-উপশিরা ও দেহের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটা দেহযন্ত্রের যথাযথ ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে এগুলোকে পরিপূর্ণ সতেজ ও কার্যকর রাখতে ইয়োগাই অনন্য মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে যোগাসনগুলো ছাড়াও বিভিন্ন মুদ্রাগুলোর সমকক্ষ কোন পদ্ধতি একমাত্র ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম ছাড়া অন্য কোন ব্যায়ামে এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। যেভাবে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের সক্রিয় সুস্থতা রক্ষার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে ইয়োগার শ্বাস-ব্যায়াম প্রাণায়াম। এমনকি অত্যাবশ্যকীয় ইন্দ্রিয়গুলোর কার্য়কর সুরক্ষার জন্যেও ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

খাবার গ্রহণ করলেই দেহের কাজ শেষ হয়ে যায় না। এই খাদ্য থেকে বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খাদ্য-উপাদান ও খাদ্যরস সংগ্রহ শেষে পরিত্যক্ত খাদ্যবর্জ্যগুলো মল-মূত্র ঘাম বা কফ হিসেবে শরীর থেকে বের করে দিতে হয়। এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হলেও শরীর অসুস্থ হয়ে পড়তে বাধ্য। এই প্রক্রিয়াটাকে সুস্থ সচল রাখতে অন্য সাধারণ ব্যায়ামে কোন উপায় না থাকলেও ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়ামে প্রয়োজনীয় ধৌতিগুলো খুবই কার্যকর উপায়।

জীবন যাপনের চলমান বাস্তবতায় যে সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি রাষ্ট্র পরিবেশ ও পরিস্থিতি উদ্ভুত স্ট্রেস বা মনো-দৈহিক চাপের মধ্য দিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত পার করতে হয় আমাদের, তা থেকে পরিত্রাণের যে ছটফটানি, এটা আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রতিনিয়ত ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে যাচ্ছে। সেই দুঃসহ চাপের উৎস পরিবর্তনের সুযোগ বা সামর্থ হয়তো আমাদের নেই। কিন্তু সেই অসহনীয় চাপ সফলভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে স্নায়ুরোগসহ যে মনো-দৈহিক সমস্যা বা রোগের বিস্তার ঘটে, প্রয়োজনীয় শিথিলায়ন ও প্রয়োজনীয় নিরাময়ের ব্যবস্থা না নিলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। এই মনো-দৈহিক সমস্যা উত্তরণে অনন্যোপায় আমাদেরকে এ জন্যেও ইয়োগার আশ্রয়ই নিতে হবে।

প্রিয় পাঠক, চিন্তা বা ধারণা স্বচ্ছ না হলে আয়নায় নিজের অবয়ব দেখেও স্পষ্ট করে বুঝার উপায় নেই যে, বস্তুত যা হওয়ার কথা, নিজের সাথে তার কোথায় কেন কিভাবে কতটুকু তফাৎ বা পার্থক্য পরিদৃষ্ট হচ্ছে এবং কিভাবে তার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। সেজন্যই আমাদের জানার আগ্রহটাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। দেহ-মনের সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা করে সুস্থ-সুন্দর জীবন-যাপনের এ যাবৎ শ্রেষ্ঠ উপায় যেহেতু ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা, তাই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি জানার সাথে সাথে পরিপূর্ণভাবে অভ্যাসের সুবিধার্থে ইয়োগা দর্শনটাকেও জানা আবশ্যক বিবেচনা করি। আমি কেন ইয়োগা চর্চা করবো (Why do I practice Yoga) তা যেমন বুঝতে হবে, তেমনি জানতে হবে ইয়োগা কী বা এর ইতিহাস, আধুনিক ইয়োগার জনক হিসেবে চিহ্ণিত গুরু পতঞ্জলি কেন তাঁর অভ্রান্ত অষ্টাঙ্গযোগ মানব সভ্যতাকে উপহার দিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ প্রায়োগিক ও মনো-দৈহিক স্বাস্থ্য দর্শন হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই এটাকে ধর্মীয় আধ্যাত্মিক দর্শন ভেবে ভুল করে ফেলেন কেন ? কিসের ভিত্তিতে আমরা ইয়োগা অনুশীলন করবো এবং অন্য ব্যায়ামের সাথে এর মৌলিক ভিন্নতা কোথায় তা যেমন জানতে হবে, তেমনি এর জ্ঞাতব্য বিষয়গুলোও মনোযোগ সহকারে ধারণ করে নিতে হবে। এসব বিষয় আগ্রহে বিশ্বাসে অনুধাবন করে নিজের প্রতি আস্থা ফিরে পেলেই কেবল নিজেকে ইয়োগা চর্চায় প্রস্তুত বলে গণ্য করতে হবে। এবং এ জন্য আপনাকে প্রতিদিন কেবল নিজের জন্য তিরিশটি মিনিট ব্যয় করতে প্রতিজ্ঞ হতে হবে।

ইয়োগা একটি পরিপূর্ণ দর্শন। অমিত ধৈর্য্য, প্রয়োজনীয অনুশীলন ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মধ্য দিয়ে মনো-দৈহিক স্বাস্থ্য ও সামর্থ অর্জনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানবসত্তার চরম উৎকর্ষতা অর্জনের উপায়ই এই দর্শনের অভীষ্টতা। ব্যক্তি তার চেষ্টা ও সামর্থ্য অনুযায়ী ফললাভ করে থাকেন। সাধক যোগী পুরুষ যেমন প্রয়োজনীয় তপস্যার মাধ্যমে নিজেকে আধ্যাত্মিক শিখরে আরোহন করতে পারেন, তেমনি ব্যক্তি-সাধারণের দৈহিক সুস্থতা ও সামর্থ অর্জনের জন্য এখানে উল্লেখ রয়েছে প্রচুর আসন, মুদ্রা, প্রাণায়ামধৌতি অভ্যাসের। যোগশাস্ত্রিরা এগুলোর প্রতিটার কার্য-কারণ, সতর্কতা ও ফললাভের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সুন্দরভাবে। এমনকি প্রচলিত রোগ-বালাই নিরাময় কিংবা তা থেকে মুক্ত থাকার উপায়ও বাৎলে দিয়েছেন। দেহগঠন, বয়স কিংবা রোগ বিবেচনায় নিজ প্রয়োজনে ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যচর্চা নির্বাচনের কৌশলও বর্ণিত হয়েছে এতে। একমাত্র ইয়োগা ছাড়া মানবদেহ ও মনের এমন পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য দর্শন আদৌ আর আছে কিনা জানা নেই।

যদি আমরা আমাদের অবিকল্প এই দেহটিকে সকল কর্মকাণ্ডের কার্য ও কারণ বলে বিশ্বাস করতে সক্ষম হই, তাকে সুস্থ সবল সক্রিয় ও সুন্দর রাখতে উদ্ভুত প্রশ্নটি ‘আপনি কেন ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা করবেন’ এভাবে না হয়ে হওয়া উচিৎ- আপনি কেন ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম চর্চা করবেন না !

(C) কপিরাইট:
। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত ও ব্যবহৃত যাবতীয় ছবির নিজ নিজ উৎসের স্বীকৃত স্বত্ব কৃতজ্ঞতার সাথে বহাল রেখে- এই হাইপার-লিঙ্কড পাণ্ডুলিপির সর্বস্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত ।

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে | ০৫ | অনুশীলনের ভিত্তি |

[Yoga] ইয়োগা: সুদেহী মনের খোঁজে | ০৫ | অনুশীলনের ভিত্তি |
– রণদীপম বসু

একজন ইয়োগা চর্চাকারীকে তাঁর দেহ-মনের সুস্থতা ও উৎকর্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে দুটো পর্যায়ে অনুশীলনের প্রস্তুতি নিতে হয়। একটি হচ্ছে তাত্ত্বিক বা ভাবগত পর্যায়ের অনুশীলন। অন্যটি শারীরিক বা দৈহিক অনুশীলন।

যেহেতু ইয়োগা হচ্ছে যুগপৎ দেহ ও মনের অনুশীলন, সে জন্যে তাত্ত্বিক অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর মধ্যে ইয়োগার প্রভাবের ইতিবাচক সম্ভাবনাগুলোকে বিশ্বাসের পর্যায়ে নিয়ে আসা জরুরি। এই বিশ্বাস কোন হাওয়াই বিশ্বাস নয়। এক ধরনের অটোসাজেশান, যা তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন পরিবর্তনযোগ্যতা থাকলে তাও পর্যালোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। আমি কী ? আমার ক্ষমতা কতটুকু ? আমার কী আছে ? আর কী প্রয়োজন ? নৈতিকতা কী ? নৈতিকতার সাথে কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজনের কোন বিরোধ আছে কিনা ইত্যাদি। মনকে সুস্থ রাখার জন্য এসব প্রশ্ন এবং তার উত্তর খুঁজে বের করা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে বলেই মনের সুস্থতার জন্য একটা আচরণবিধি ইয়োগা চর্চায় জরুরি হয়ে পড়ে। মূলতঃ পতঞ্জলির অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম দুটো অঙ্গ সময় কাল পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে জারিত হয়ে এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে বিভিন্ন আসন প্রাণায়াম মেডিটেশনের শারীরিক ও মনোদৈহিক অনুশীলনের মাধ্যমে দেহ ও মনকে রোগমুক্ত সুস্থ ও অফুরন্ত প্রাণশক্তির আঁধার হিসেবে গড়ে তোলার দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক চর্চা।

কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, ইয়োগার সরলার্থে কতকগুলো যোগব্যায়ামের পদ্ধতি উল্লেখ করে তা চর্চার প্রক্রিয়া ও উপকার কী কী বর্ণনা করে দিলেই যেখানে ল্যাঠা চুকে যেতো, সেখানে এতোসব কাসুন্দি ঘাটার দরকারটা কী ছিলো ? তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে হচ্ছে যে, এটা করলে আসলে ল্যাঠা চুকে যেতো কিনা জানি না, তবে বিরাট একটা অসম্পূর্ণতা তৈরি হতো বলে ধারণা, যাতে তাত্ত্বিক অনুশীলনের প্রস্তুতিটাই তৈরি হতো না। লোহা গরমে রেঙে না উঠলে যেমন কোন সৃষ্টির অনিবার্য নমনীয়তা আসে না, এটাও ঠিক তেমনই। চর্মচোখে আমরা অন্যের যোগাসনে বা যোগব্যায়ামের যে চিত্ররূপ দেখি, এটাই সবকিছু নয়। এই দেখার ভেতরেও আরো যেসব গুরুত্বপূর্ণ দেখার বিষয় রয়ে গেছে সেগুলোই ইয়োগার প্রাণ। কেননা ইয়োগার প্রতিটা আসনে দেহভঙ্গি বিন্যস্ততার সাথে সুশৃঙ্খল শ্বাস-প্রশ্বাস ও মনের যে রাখিবন্ধন অত্যন্ত জরুরি, সেটা স্থাপন না হলে যোগচর্চাটাই বিফলে চলে যেতে পারে। আর এ বিষয়টাকে মাথায় রেখেই বিষয়সংশ্লিষ্টতার কারণে ইয়োগার দর্শনসূত্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এতোসব প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা।

তাই ইয়োগা সম্পর্কে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হিসেবে অবশ্যই আমাদেরকে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট করে নিতে হয়, তা হচ্ছে-

১.০ ইয়োগা আলাদা কোন ধর্মমত বা বিশ্বাস নয়। বরং এর উল্টো। এটা একটা সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সাধন প্রক্রিয়া।

২.০ এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজনকে চিহ্ণিত করে মনের মধ্যে সম্ভাব্যতাগুলো ধারণ করার মতো একটা বিশ্বাস তৈরির মাধ্যমে নিজের উপর আস্থাবোধ গড়ে তুলতে হয়।

৩.০ যে পদ্ধতিতে এই আস্থাবোধ গড়ে তুলতে হয়, তাকে কেউ কেউ মেডিটেশনও বলে থাকেন। তবে মনকে সম্পৃক্তকরণের মধ্যে নিহিত রয়েছে এর জাদুকরি সাফল্য।

৪.০ এ বিশ্বাস কোন অলৌকিক বিশ্বাস নয়। সম্পূর্ণ লৌকিক এবং দেহগত।

৫.০ এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট থাকে বলেই অনুশীলন প্রক্রিয়ার মধ্যে কোন অজ্ঞতা বা অস্পষ্টতা থাকা কাম্য নয়। কার্যকারণ সম্পর্কের মোটামুটি পরিষ্কার একটা ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়।

৬.০ সুস্থতাই যেহেতু এর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য, তাই প্রথমে দেহের উপরস্থ ও অন্তস্থিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর অবস্থান ও এদের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কেও একটা প্রাথমিক ধারণা রাখা আবশ্যক। লাগলে লাগুক, নইলে না, এরকম অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো বিষয় ইয়োগা নয়।

৭.০ মন হচ্ছে অপরিসীম ক্ষমতা সম্পন্ন সেই অলৌকিক ডাক্তার, এবং তা যে দেহনির্ভর একটা চেতনাগত অবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়, এই বিষয়টা আত্মস্থ করে এই অনন্য দেহকে ঘিরে যাবতীয় প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করতে হয়।

৮.০ দেহকে রোগমুক্ত ও প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তিময় সুস্থতায় উন্নীত করতে কতকগুলো বিশেষ দেহভঙ্গির অনুশীলনে নমনীয়তা অর্জনের মাধ্যমে দেহের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা, স্নায়ুতন্ত্র, শ্বসন প্রক্রিয়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করার যে ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয় তাকে আসন, প্রাণায়াম বা মূদ্রা বলা হয়। এর সাথে মনসম্পৃক্ততাকেও আবশ্যিক হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

৯.০ আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যে কোন ক্ষেত্রে মনঃসংযোগ বা অনায়াস একাগ্রতাই সাফল্যের নিয়ামক শক্তি। দেহস্থিত মনকে সেই শক্তিতে রাঙিয়ে তোলা ইয়োগার কাজ।

১০.০ সর্বোপরি শরীর ও মনের স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ন রেখে ধারাবাহিক চর্চর মাধ্যমে তাকে উৎকর্ষতায় উন্নীত করাই ইয়োগা চর্চার চূড়ান্ত লক্ষ্য।

১১.০ যে কোন বয়সের যে কোন ব্যক্তিই প্রয়োজন অনুযায়ী এই ইয়োগা চর্চায় অংশ নিতে পারেন।

ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়ামের শারীরিক অনুশীলন শুরুর আগে অভ্যাসকারীদের কয়েকটি জ্ঞাতব্য বিষয় মাথায় রেখেই চর্চায় নিয়োজিত হতে হয়। তবে তারও আগে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি যে বিষয় জেনে রাখা আবশ্যক, তা হচ্ছে অন্যান্য ব্যায়ামের সঙ্গে যোগ-ব্যায়ামের পার্থক্য কোথায়।

[Image: from internet]

(চলবে…)

পর্ব:[০৪][**][০৬]

[
sachalayatan]
[
somewherein]